tawbah-kobul-sharto-sothik-poddhoti
তওবা কবুলের শর্ত ও সঠিক পদ্ধতি — ইসলামের আলোকে পূর্ণাঙ্গ গাইড
তওবা কবুলের ৪টি শর্ত ও সঠিক পদ্ধতি জানুন। সাইয়্যিদুল ইস্তিগফারসহ তওবার দোয়া, কখন তওবা কবুল হয় না এবং বড় গুনাহের তওবা কবুল হয় কিনা — সম্পূর্ণ ইসলামিক গাইড।
মানুষ মাত্রই ভুল করে। গুনাহ হয়ে যায়, পাপের পথে পা বাড়িয়ে ফেলি আমরা অনেক সময়। কিন্তু আল্লাহ তাআলার অসীম রহমত এই যে, তিনি তওবার দরজা সবসময় খোলা রেখেছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন — "নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন।" (সূরা আল-বাকারা: ২২২)
কিন্তু প্রশ্ন হলো — যেকোনো তওবাই কি কবুল হয়? তওবা কবুল হওয়ার জন্য কি কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়? সঠিক পদ্ধতিতে তওবা না করলে কি তা আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হয়? এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর আজকের এই আর্টিকেলে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
📋 সুচিপত্র
১. তওবা কী এবং কেন করতে হবে?
তওবা আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো ফিরে আসা। ইসলামি পরিভাষায় তওবা বলতে বোঝায় — গুনাহ বা পাপকাজ থেকে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা এবং ভবিষ্যতে সেই পাপ না করার দৃঢ় সংকল্প করা।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন —
"হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর কাছে তওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।"
(সূরা আন-নূর: ৩১)
মানুষের জীবনে প্রতিদিনই ছোট-বড় ভুল হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন — "প্রতিটি আদম সন্তান গুনাহগার, আর গুনাহগারদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো তওবাকারীরা।" (তিরমিযি) তাই তওবা শুধু পাপীর জন্য নয়, প্রত্যেক মুমিনের জন্যই অপরিহার্য।
২. তওবার ফজিলত ও গুরুত্ব
তওবার ফজিলত অপরিসীম। আল্লাহ তাআলা তওবাকারীকে শুধু ক্ষমাই করেন না, বরং তাঁর গুনাহগুলোকে নেকিতে পরিণত করে দেন। এই মহান ঘোষণা কুরআনে বর্ণিত হয়েছে এভাবে —
"তবে যারা তওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে, আল্লাহ তাদের পাপগুলো পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন।"
(সূরা আল-ফুরকান: ৭০)
তওবার কিছু বিশেষ ফজিলত নিচে উল্লেখ করা হলো —
- আল্লাহর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি লাভ হয়
- পূর্ববর্তী সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যায়
- মনের শান্তি ও প্রশান্তি ফিরে আসে
- দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ লাভ হয়
- রিজিকে বরকত আসে
- বিপদ-মুসিবত দূর হয়
- জান্নাতের পথ সুগম হয়
রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেও প্রতিদিন ৭০ থেকে ১০০ বার তওবা ও ইস্তিগফার করতেন, যদিও তিনি নিষ্পাপ ছিলেন। এটি উম্মতের জন্য একটি শিক্ষা।
৩. তওবা কবুলের শর্তসমূহ
আলেমগণ তওবা কবুলের জন্য মূলত তিনটি প্রধান শর্তের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে গুনাহটি যদি কারো হক সংক্রান্ত হয় তাহলে আরও একটি শর্ত যুক্ত হয়।
শর্ত ১: গুনাহ থেকে বিরত হওয়া
তওবা কবুলের প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো — যে গুনাহের জন্য তওবা করা হচ্ছে সেই গুনাহ তাৎক্ষণিকভাবে ছেড়ে দিতে হবে। গুনাহ চালিয়ে যেতে যেতে তওবা করার কোনো অর্থ নেই। যে ব্যক্তি মুখে তওবা করছে কিন্তু গুনাহ ছাড়ছে না, তার তওবা আসলে তওবাই নয়।
শর্ত ২: কৃত গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হওয়া
হৃদয়ের গভীর থেকে অনুশোচনা অনুভব করতে হবে। এই অনুতাপই হলো তওবার আত্মা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন — "অনুতাপই হলো তওবা।" (ইবনে মাজাহ) শুধু মুখে "আমি তওবা করলাম" বলাই যথেষ্ট নয়, বরং গুনাহের জন্য প্রকৃত দুঃখ ও লজ্জা অনুভব করতে হবে।
শর্ত ৩: ভবিষ্যতে সেই গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প
তওবা করার সময় মনে মনে দৃঢ় নিয়ত করতে হবে যে ভবিষ্যতে আর এই পাপ করা হবে না। যদি মনে মনে এই ইচ্ছা থাকে যে "এখন তওবা করি, পরে আবার করব" — তাহলে এই তওবা গ্রহণযোগ্য নয়।
শর্ত ৪: বান্দার হক থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়া
গুনাহটি যদি কোনো মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে থাকে — যেমন কারো টাকা মেরে খাওয়া, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, কাউকে কষ্ট দেওয়া — তাহলে সেই ব্যক্তির কাছ থেকে মাফ নিতে হবে অথবা তার হক ফিরিয়ে দিতে হবে।
- গুনাহ তাৎক্ষণিকভাবে ছেড়ে দেওয়া
- কৃত গুনাহের জন্য অন্তর থেকে অনুতপ্ত হওয়া
- ভবিষ্যতে আর না করার দৃঢ় সংকল্প করা
- বান্দার হক থাকলে তা আদায় করা বা মাফ নেওয়া
৪. তওবার সঠিক পদ্ধতি
ধাপ ১: অজু করুন
তওবার আগে পবিত্রতা অর্জন করা সুন্নত। হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন — যে ব্যক্তি গুনাহ করে তারপর উত্তমরূপে অজু করে দুই রাকাত নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। (আবু দাউদ)
ধাপ ২: দুই রাকাত সালাতুত তওবা পড়ুন
অজু করার পর দুই রাকাত নামাজ পড়ুন। এই নামাজকে "সালাতুত তওবা" বলা হয়। নামাজে একাগ্রতার সাথে আল্লাহর সামনে নিজেকে উপস্থিত ভাবুন।
ধাপ ৩: হৃদয় থেকে অনুতপ্ত হোন
নামাজের পরে বা নামাজে সিজদারত অবস্থায় অন্তর থেকে গভীরভাবে অনুশোচনা করুন। মনে করুন আপনি আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এবং তিনি সব দেখছেন।
ধাপ ৪: ইস্তিগফার করুন
মুখে আস্তাগফিরুল্লাহ বলুন এবং তওবার দোয়া পাঠ করুন। বেশি বেশি ইস্তিগফার করুন — বিশেষত সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার পড়ুন।
ধাপ ৫: নেক আমল দিয়ে পাপ ঢেকে দিন
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন — "পাপের পরে নেক আমল করো, নেক আমল পাপকে মুছে দেয়।" (তিরমিযি) তাই তওবার পরে বেশি বেশি নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা ও অন্যান্য ইবাদত করুন।
৫. তওবার দোয়া ও যিকির
সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার (সর্বশ্রেষ্ঠ ক্ষমার দোয়া)
اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ وَأَبُوءُ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আনতা রাব্বি, লা ইলাহা ইল্লা আনতা, খালাকতানি ওয়া আনা আবদুকা, ওয়া আনা আলা আহদিকা ওয়া ওয়া'দিকা মাস্তাতা'তু, আউযু বিকা মিন শাররি মা সানা'তু, আবূউ লাকা বিনি'মাতিকা আলাইয়্যা ওয়া আবূউ বিযাম্বি ফাগফিরলি, ফাইন্নাহু লা ইয়াগফিরুয যুনূবা ইল্লা আনতা।
অর্থ: হে আল্লাহ! তুমি আমার রব। তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছ এবং আমি তোমার বান্দা। আমি আমার সাধ্যমতো তোমার প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের উপর আছি। আমি আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাই। তোমার নিয়ামত আমার উপর আছে তা আমি স্বীকার করি এবং আমার গুনাহও স্বীকার করি। সুতরাং তুমি আমাকে ক্ষমা করো। কারণ তুমি ছাড়া আর কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারে না।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন — যে ব্যক্তি দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে সকালে এই দোয়া পড়বে এবং সেদিন সন্ধ্যার আগে মারা যাবে, সে জান্নাতি। আর যে সন্ধ্যায় পড়বে এবং সকাল হওয়ার আগে মারা যাবে, সেও জান্নাতি। (বুখারি)
অন্যান্য তওবার দোয়া
رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
উচ্চারণ: রাব্বানা যালামনা আনফুসানা, ওয়া ইল্লাম তাগফিরলানা ওয়া তারহামনা লানাকূনান্না মিনাল খাসিরিন।
অর্থ: হে আমাদের প্রভু! আমরা নিজেদের উপর জুলুম করেছি। যদি আপনি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং দয়া না করেন, তাহলে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। (সূরা আল-আরাফ: ২৩)
৬. যেসব কারণে তওবা কবুল হয় না
- মৃত্যুর সময় তওবা করা: মৃত্যুর লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর তওবা আর কবুল হয় না। (সূরা আন-নিসা: ১৮)
- সূর্য পশ্চিম দিকে উদয়ের পরে তওবা: কেয়ামতের আগে যখন সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদয় হবে তখন তওবার দরজা বন্ধ হয়ে যাবে।
- গুনাহ না ছেড়ে তওবা করা: মুখে তওবা করা কিন্তু গুনাহ অব্যাহত রাখা — এ ধরনের তওবা কবুল হয় না।
- শুধু ভয়ের কারণে তওবা: তওবা হতে হবে আল্লাহর ভালোবাসা ও ভয় উভয়ের মিশ্রণে।
- বান্দার হক আদায় না করা: কারো হক নষ্ট করে তওবা করলে সেই হক আদায় না করা পর্যন্ত সম্পূর্ণ মাফ হয় না।
৭. বড় গুনাহের তওবা কি কবুল হয়?
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে — আমি অনেক বড় বড় গুনাহ করেছি, আমার কি তওবা কবুল হবে? এর উত্তর হলো — হ্যাঁ, অবশ্যই হবে। আল্লাহর রহমত সব গুনাহকে ছাড়িয়ে যায়।
"বলুন, হে আমার বান্দারা যারা নিজেদের উপর অত্যাচার করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল গুনাহ মাফ করেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু।"
(সূরা আয-যুমার: ৫৩)
শিরক ব্যতীত সকল গুনাহই আল্লাহ মাফ করে দিতে পারেন যদি বান্দা সত্যিকারের তওবা করে।
৮. তওবার পরে আবার গুনাহ হলে কী করবেন?
মানুষ দুর্বল। তওবা করার পরেও আবার গুনাহ হয়ে যেতে পারে। এতে হতাশ হওয়া উচিত নয়। বরং আবার তওবা করতে হবে। আল্লাহর দরবার সবসময় খোলা।
"হে আদম সন্তান! যতক্ষণ তুমি আমাকে ডাকবে এবং আমার কাছে আশা রাখবে, আমি তোমাকে ক্ষমা করতে থাকব, তুমি যা-ই করো না কেন। হে আদম সন্তান! তোমার গুনাহ যদি আকাশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তারপর তুমি আমার কাছে ক্ষমা চাও, আমি তোমাকে ক্ষমা করব।"
(তিরমিযি)
৯. তওবা কবুলের সময়সীমা আছে কি?
ব্যক্তিগত সময়সীমা: মৃত্যুর গড়গড়া শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত তওবা কবুল হয়।
সামগ্রিক সময়সীমা: পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদয়ের আগ পর্যন্ত সকলের জন্য তওবার দরজা খোলা।
১০. উপসংহার
তওবা আল্লাহর এক অসাধারণ নেয়ামত। যত বড় গুনাহই হোক না কেন, আল্লাহর রহমতের দরজা সবসময় খোলা। শুধু প্রয়োজন — আন্তরিকতার সাথে গুনাহ ছেড়ে দেওয়া, অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে না করার সংকল্প করা।
আজ থেকেই শুরু করুন। বেশি বেশি ইস্তিগফার করুন, সালাতুত তওবা পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান।
"আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদেরও ভালোবাসেন।"
(সূরা আল-বাকারা: ২২২)
আল্লাহ আমাদের সকলকে সত্যিকারের তওবা করার এবং সেই তওবায় অটল থাকার তওফিক দান করুন। আমিন।
এই আর্টিকেলটি কুরআন ও হাদিসের আলোকে লেখা হয়েছে। আরও বিস্তারিত জানতে আলেমদের পরামর্শ নিন।
এরকম আরো আর্টিকেল পড়তে ভিজিট করুন: mamunskblog.com
.webp)

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url