ফিতরা কত টাকা-২০২৬ | কার উপর ওয়াজিব ও কীভাবে দেবেন

ফিতরা কত টাকা ২০২৬? জানুন ফিতরার পরিমাণ, কার উপর ওয়াজিব, কখন ও কীভাবে দিতে হয় এবং কাদের দেওয়া যাবে — সম্পূর্ণ ইসলামিক গাইড।
ফিতরা-ক-টাকা-২০২৬

ফিতরা বা সাদাকাতুল ফিতর ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব ইবাদত। রমজান মাস শেষ হওয়ার আগেই প্রতিটি সামর্থ্যবান মুসলমানকে এটি আদায় করতে হয়। ২০২৬ সালে বাংলাদেশে ফিতরার হার নির্ধারণ করা হয়েছে — সর্বনিম্ন ১১০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২,৮০৫ টাকা। কিন্তু কার উপর ফিতরা ওয়াজিব, কীভাবে দেবেন এবং কত টাকা দেবেন — এই সব প্রশ্নের উত্তর নিয়েই আজকের এই বিস্তারিত গাইড।


🌙 ফিতরা কী এবং কেন দিতে হয়?

সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা হলো রমজান মাসের রোজা শেষে ঈদুল ফিতরের নামাজের আগে আদায়কৃত একটি নির্ধারিত দান। এটি ইসলামে ওয়াজিব (অবশ্য পালনীয়)।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত: "রাসূলুল্লাহ (সা.) সাদাকাতুল ফিতরকে ওয়াজিব করেছেন — রোজার মধ্যে সংঘটিত অনর্থক ও অশ্লীল কথাবার্তার কাফফারা হিসেবে এবং মিসকিনদের আহারের ব্যবস্থা হিসেবে।"
— (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ১৬০৯)

ফিতরার মূল উদ্দেশ্য দুটি:

  • রোজার ত্রুটি পূরণ: রমজানে রোজার মধ্যে অজান্তে যে ছোটখাটো ভুল বা গাফিলতি হয়, তার পরিশুদ্ধি।
  • গরিবদের ঈদ আনন্দে শামিল করা: যাতে দরিদ্র মুসলমানরাও ঈদের দিন আনন্দিত হতে পারেন।

✅ কার উপর ফিতরা ওয়াজিব?

ফিতরা কার উপর ওয়াজিব সেটা জানা অত্যন্ত জরুরি। নিচের টেবিলে বিস্তারিত দেওয়া হলো:

শর্ত / বিষয় বিবরণ ফিতরা দিতে হবে?
মুসলিম হওয়া প্রতিটি মুসলিম নর ও নারীর উপর প্রযোজ্য ✅ হ্যাঁ
নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক ৭.৫ তোলা সোনা বা ৫২.৫ তোলা রুপার সমমূল্য সম্পদ থাকলে ✅ হ্যাঁ
ঈদের রাতে জীবিত থাকা রমজানের শেষ রাত (ঈদের চাঁদ রাত) পর্যন্ত জীবিত থাকতে হবে ✅ হ্যাঁ
নাবালেগ সন্তান বাবাকে নাবালেগ ছেলেমেয়ের পক্ষে ফিতরা দিতে হবে ✅ হ্যাঁ (বাবার উপর)
পাগল / বিবেকহীন সন্তান বালেগ পাগল সন্তানের ফিতরাও বাবা দেবেন ✅ হ্যাঁ (বাবার উপর)
স্ত্রীর ফিতরা স্ত্রী নিজে সামর্থ্যবান হলে নিজে দেবেন, স্বামী দিলেও হবে ✅ নিজে বা স্বামী
দরিদ্র ব্যক্তি নিসাব পরিমাণ সম্পদ নেই — ফিতরা মাফ ❌ না
ঈদের আগে মৃত্যু ঈদের রাতের আগে মারা গেলে ফিতরা ওয়াজিব নয় ❌ না
⚠️ গুরুত্বপূর্ণ: নিসাব নির্ধারণের ক্ষেত্রে মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র (বাড়ি, কাপড়, ব্যবহারের আসবাব) বাদ দিয়ে যা বাকি থাকে তার হিসাব করতে হবে।
ফিতরা-ক-টাকা-২০২৬

💰 ফিতরার হার ২০২৬ — বাংলাদেশ

২০২৬ সালে বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক ফিতরার হার নির্ধারণ করা হয়েছে। ইসলামে ৫টি খাদ্যপণ্যের যেকোনো একটি দিয়ে বা সেটির বাজারমূল্যে ফিতরা দেওয়া যায়:

খাদ্যপণ্য পরিমাণ প্রতি জনের ফিতরা মন্তব্য
গম / আটা ১.৬৫ কেজি (অর্ধ সা) ১১০ টাকা ✅ সর্বনিম্ন হার
যব (বার্লি) ৩.৩ কেজি (১ সা) ৫৯৫ টাকা
কিসমিস ৩.৩ কেজি (১ সা) ২,৬৪০ টাকা
খেজুর ৩.৩ কেজি (১ সা) ২,৪৭৫ টাকা
পনির (চিজ) ৩.৩ কেজি (১ সা) ২,৮০৫ টাকা ⭐ সর্বোচ্চ হার
📌 দ্রষ্টব্য: যেকোনো একটি পণ্যের হারে ফিতরা দিলেই আদায় হবে। তবে সামর্থ্য অনুযায়ী বেশি দেওয়াই উত্তম। ২০২৬ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এই হার নির্ধারণ করেছে।

🤝 ফিতরা কীভাবে দেবেন?

ফিতরা দেওয়ার দুইটি পদ্ধতি রয়েছে:

পদ্ধতি বিবরণ অনুমোদিত কিনা?
খাদ্যপণ্য হিসেবে গম, আটা, যব, খেজুর, কিসমিস বা পনির নির্ধারিত পরিমাণে সরাসরি দেওয়া ✅ জায়েজ (মূল পদ্ধতি)
নগদ টাকায় খাদ্যপণ্যের বাজারমূল্য পরিমাণ টাকা দেওয়া (যেমন গমের হারে ১১০ টাকা) ✅ জায়েজ (হানাফি মাযহাব)
মসজিদের মাধ্যমে মসজিদের ইমাম বা মুতাওয়াল্লির কাছে দিলে তারা বিতরণ করবেন ✅ জায়েজ
সরাসরি গরিবকে পরিচিত দরিদ্র মুসলমানকে নিজে হাতে দেওয়া ✅ উত্তম পদ্ধতি
ইসলামিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বা বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠানে দেওয়া ✅ জায়েজ

⏰ ফিতরা আদায়ের সঠিক সময়

ফিতরা আদায়ের সময় নিয়ে অনেকে বিভ্রান্তিতে পড়েন। নিচের টেবিলে সময়ের হুকুম স্পষ্টভাবে দেওয়া হলো:

সময়কাল হুকুম ব্যাখ্যা
রমজানের শুরু থেকে জায়েজ আগেভাগে দেওয়া যাবে, গুনাহ নেই
ঈদের আগের রাত (রমজানের শেষ রাত) ✅ উত্তম সময় এই রাত থেকে দেওয়া শুরু করা সুন্নত
ঈদের দিন সকালে (নামাজের আগে) ✅ সর্বোত্তম সর্বোত্তম ও মুস্তাহাব সময় — এই সময় দিলে পূর্ণ সওয়াব
ঈদের নামাজের পরে ⚠️ মাকরুহ সওয়াব কমে যাবে, তবে ফিতরা আদায় হবে
ঈদের দিন পার হয়ে গেলে ❌ কাজা / গুনাহ অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে, দেরির জন্য তওবা করতে হবে

"যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের আগে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করল, তার ফিতরা কবুল সাদাকা হিসেবে গণ্য হবে। আর যে নামাজের পরে আদায় করল, তার ফিতরা সাধারণ সাদাকার মতো।"
— (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ১৬০৯)


🎁 ফিতরা কে পাবেন?

ফিতরা কাকে দেওয়া যাবে এবং কাকে দেওয়া যাবে না — নিচের টেবিলে তা স্পষ্ট করা হলো:

গ্রহণকারী দেওয়া যাবে? কারণ
দরিদ্র মুসলমান ✅ হ্যাঁ প্রধান হকদার
মিসকিন (অতি দরিদ্র) ✅ হ্যাঁ সবচেয়ে উত্তম পাত্র
ঋণগ্রস্ত দরিদ্র ব্যক্তি ✅ হ্যাঁ যাকাতের হকদার হলে ফিতরাও পাবেন
নিজের মাতাপিতা ❌ না ওয়াজিব ভরণপোষণের কারণে দেওয়া যাবে না
নিজের স্ত্রী/স্বামী ❌ না ওয়াজিব ভরণপোষণের কারণে দেওয়া যাবে না
নিজের ছেলেমেয়ে ❌ না সরাসরি আশ্রিত হওয়ায় দেওয়া যাবে না
অমুসলিম ব্যক্তি ❌ না হানাফি মাযহাব অনুযায়ী দেওয়া জায়েজ নয়
সম্পদশালী ব্যক্তি ❌ না নিসাব পরিমাণ সম্পদ আছে যার

🧮 পরিবারের মোট ফিতরার হিসাব

অনেকে জানতে চান পুরো পরিবারের ফিতরা মিলিয়ে কত হবে। নিচে একটি উদাহরণ দেওয়া হলো (গমের হারে — সর্বনিম্ন ১১০ টাকা হিসেবে):

পরিবারের সদস্য সংখ্যা প্রতি জনের ফিতরা মোট টাকা
পিতা (নিজের) ১ জন ১১০ টাকা ১১০ টাকা
মাতা ১ জন ১১০ টাকা ১১০ টাকা
স্ত্রী ১ জন ১১০ টাকা ১১০ টাকা
নাবালেগ ছেলেমেয়ে ২ জন ১১০ টাকা ২২০ টাকা
বালেগ সন্তান (নিজে উপার্জনক্ষম) ১ জন ১১০ টাকা ১১০ টাকা
মোট পরিবারের ফিতরা (গমের হারে) = ৬৬০ টাকা
💡 টিপস: সামর্থ্য থাকলে গমের হারের চেয়ে বেশি দেওয়াই উত্তম। যব, খেজুর, কিসমিস বা পনিরের হারে দিলে আরও বেশি সওয়াব পাওয়া যায়।

📌 সংক্ষিপ্ত সারাংশ

বিষয় তথ্য
ফিতরার হুকুম ওয়াজিব (অবশ্য পালনীয়)
সর্বনিম্ন ফিতরা ২০২৬ ১১০ টাকা (গমের হারে)
সর্বোচ্চ ফিতরা ২০২৬ ২,৮০৫ টাকা (পনিরের হারে)
সর্বোত্তম সময় ঈদের নামাজের আগে
ফিতরার নিসাব ৭.৫ তোলা সোনা বা ৫২.৫ তোলা রুপার সমতুল্য
প্রধান হকদার দরিদ্র ও মিসকিন মুসলমান
দেওয়ার মাধ্যম নগদ টাকা বা নির্ধারিত খাদ্যপণ্য

ফিতরা শুধু একটি আর্থিক দায়িত্ব নয় — এটি একটি আত্মিক পরিশুদ্ধির সুযোগ এবং সমাজের দুর্বল মানুষদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের সুন্দর একটি ইবাদত। আল্লাহ আমাদের সকলকে সঠিক সময়ে ফিতরা আদায়ের তওফিক দান করুন। আমিন।

এই আর্টিকেলটি তথ্যমূলক উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে। ফিতরার হার পরিবর্তনশীল হতে পারে। সর্বশেষ তথ্যের জন্য বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট দেখুন।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url